ওয়েব ডেস্ক; ৬ জুন:
বন্ড বাজারের সশক্তিকরণ, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ
ভারতকে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগের অন্যতম প্রধান গন্তব্য হিসেবে আরও শক্তিশালী করে তুলতে সরকার ধারাবাহিক সংস্কার কার্যক্রম গ্রহণ করছে। পুঁজিবাজারকে আরও গভীর ও শক্তিশালী করার লক্ষ্যে সরকারি সিকিউরিটিজ (G-Secs)-এ বিদেশি পোর্টফোলিও বিনিয়োগকারীদের (FPI) অংশগ্রহণ বৃদ্ধির জন্য একাধিক সংস্কার কার্যকর করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সুদের আয়, দীর্ঘমেয়াদী মূলধনী মুনাফা (LTCG) এবং স্বল্পমেয়াদী মূলধনী মুনাফা (STCG)-এর উপর কর ছাড়, FAR-এর আওতায় নির্দিষ্ট সিকিউরিটিজের পরিধি সম্প্রসারণ এবং বিনিয়োগ সংক্রান্ত বিধিনিষেধ শিথিলকরণ।

এই সংস্কারের লক্ষ্য হল দীর্ঘমেয়াদী ও স্থিতিশীল বিদেশি মূলধন আকর্ষণ করা, G-Sec বাজারকে আরও গভীর করা এবং বিনিয়োগকারীদের ভিত্তিকে সম্প্রসারিত ও বৈচিত্র্যময় করে ভারতের ঋণ বাজারকে আরও শক্তিশালী করে তোলা। বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি পরিকাঠামো, উৎপাদন, নগর উন্নয়ন, জলবায়ু সংক্রান্ত উদ্যোগ এবং অন্যান্য জাতীয় অগ্রাধিকারের জন্য অতিরিক্ত অর্থায়নের উৎস তৈরি করবে। পাশাপাশি এটি বাজারে তারল্য ও মূল্য নির্ধারণের দক্ষতা বৃদ্ধি করবে, আরও সুসংহত ই-ইল্ড কার্ভ গঠনে সহায়তা করবে, সরকারের ঋণ গ্রহণের ব্যয় কমাবে, আর্থিক বাজারের মানদণ্ডকে শক্তিশালী করবে এবং সমগ্র অর্থনীতিতে মুদ্রানীতির কার্যকর সঞ্চালন নিশ্চিত করবে।

কর ব্যবস্থায় কি পরিবর্তন হয়েছে

সাম্প্রতিক সংস্কারের আগে, বিদেশি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী (FII) এবং সেবি-নিবন্ধিত বিদেশি পোর্টফোলিও বিনিয়োগকারীরা (FPI) আয়কর আইন, ২০২৫-এর ধারা ২১০-এর অধীনে করের আওতাভুক্ত ছিলেন। সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ থেকে অর্জিত যে কোনও আয়ের উপর কর প্রযোজ্য ছিল।

বিশেষভাবে:

  • G-Secs থেকে অর্জিত সুদের আয়ের উপর FII/FPI-দের ২০ শতাংশ হারে কর দিতে হত।
  • G-Secs বিক্রির ফলে অর্জিত স্বল্পমেয়াদী মূলধনী মুনাফার উপর লেনদেনের প্রকৃতির ভিত্তিতে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কর আরোপিত হত।
  • দীর্ঘমেয়াদী মূলধনী মুনাফার উপর ১২.৫ শতাংশ কর ধার্য ছিল।

ফলে সরকারি সিকিউরিটিজ ধারণ বা লেনদেনের মাধ্যমে অর্জিত আয়ের একটি অংশ ভারতে কর হিসাবে প্রদান করতে হত।

নতুন কর ব্যবস্থা

বিশ্বব্যাপী মূলধন আকর্ষণে প্রতিযোগিতামূলক কর কাঠামোর গুরুত্ব বিবেচনা করে সরকার G-Secs-এ বিনিয়োগকারী FPI/FII-দের জন্য কর ছাড়ের ব্যবস্থা চালু করেছে।

নতুন ব্যবস্থার অধীনে FPI/FII-রা নিম্নলিখিত ক্ষেত্রে করমুক্ত সুবিধা পাবেন:

  • সরকারি সিকিউরিটিজ থেকে অর্জিত সুদের আয়; এবং
  • সরকারি সিকিউরিটিজ বা আর্থিক লেনদেনযোগ্য সম্পদ বিক্রয়, হস্তান্তর, বিনিময় বা পরিশোধের মাধ্যমে অর্জিত মূলধনী মুনাফা।

এই কর ছাড় ১ এপ্রিল ২০২৬ বা তার পর থেকে অর্জিত আয়ের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে। আয়কর (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৬-এর মাধ্যমে G-Secs-এ বিনিয়োগকারী FII-দের জন্য এই বিশেষ কর ছাড়ের বিধান অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

G-Sec বাজারে সংস্কার

বিদেশি বিনিয়োগকারীরা সাধারণত জেনারেল রুট এবং ফুল্লী এক্সেসিবল রুট (FAR)-এর মাধ্যমে ভারতীয় সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ করতে পারেন।

জেনারেল রুট হল বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য প্রচলিত বিনিয়োগের পথ। এর মাধ্যমে অনুমোদিত ভারতীয় সরকারি সিকিউরিটিজ ক্রয়-বিক্রয় করা যায়, তবে, নির্দিষ্ট সিকিউরিটিজে বিনিয়োগের সীমা, ধারণকাল এবং সামগ্রিক বিনিয়োগ সীমার মতো কিছু বিধিনিষেধ প্রযোজ্য থাকে।

অন্যদিকে, FAR হল একটি উন্মুক্ত বিনিয়োগ ব্যবস্থা, যেখানে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা নির্দিষ্ট সরকারি সিকিউরিটিজে জেনারেল রুট-এর বিধিনিষেধ ছাড়াই বিনিয়োগ করতে পারেন।

FAR-এর সম্প্রসারণ

সরকার FAR-এর আওতায় অন্তর্ভুক্ত সিকিউরিটিজ বা লেনদেনযোগ্য আর্থিক সম্পদের তালিকা সম্প্রসারণ করেছে, যার ফলে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য আরও বিস্তৃত পরিসরে সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।

এখন FAR-এর আওতায় অন্তর্ভুক্ত হবে:

  • নতুন ইস্যুকৃত ১৫ বছর মেয়াদী সরকারি সিকিউরিটিজ বা লেনদেনযোগ্য আর্থিক সম্পদ;
  • নতুন ইস্যুকৃত ৩০ বছর মেয়াদী সরকারি সিকিউরিটিজ বা লেনদেনযোগ্য আর্থিক সম্পদ;
  • নতুনভাবে ইস্যু করা ৪০ বছর মেয়াদী সরকারি সিকিউরিটিজ বালেনদেনযোগ্য আর্থিক সম্পদ; এবং
  • FAR-যোগ্য মেয়াদে ইস্যুকৃত সার্বভৌম হরিৎ বন্ড।

জেনারেল রুট-এর অধীনে বিনিয়োগ সংক্রান্ত বিধিনিষেধ শিথিলকরণ

G-Secs-এ বিদেশি পোর্টফোলিও বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ আরও সহজ করতে সরকার নিম্নলিখিত সীমাবদ্ধতাগুলি তুলে দিয়েছে:

  • স্বল্পমেয়াদী বিনিয়োগ সীমা;
  • ঘনত্বভিত্তিক বিনিয়োগ সীমা; এবং
  • সিকিউরিটিভিত্তিক বিনিয়োগ সীমা।

তবে সামগ্রিক বিনিয়োগ সীমা অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে:

  • কেন্দ্রীয় সরকারি সিকিউরিটিজ বা লেনদেনযোগ্য আর্থিক সম্পদের মোট বকেয়া স্টকের ৬ শতাংশ; এবং
  • রাজ্য সরকারি সিকিউরিটিজ (SGS) বা লেনদেনযোগ্য আর্থিক সম্পদ-এর মোট বকেয়া স্টকের ২ শতাংশ।
    আরও গভীর ও সংযুক্ত পুঁজিবাজারের পথে

বাজারে প্রবেশের প্রক্রিয়া সহজতর করা এবং পরিচালনাগত জটিলতা কমানোর মাধ্যমে এই পদক্ষেপগুলি আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি নির্বিঘ্ন বিনিয়োগ পরিবেশ গড়ে তুলবে। দীর্ঘমেয়াদে এগুলি ভারতীয় বন্ডকে বিশ্বব্যাপী সূচকে অন্তর্ভুক্ত করার সম্ভাবনা বাড়াবে, দীর্ঘমেয়াদী বিদেশি মূলধন আকর্ষণ করবে, ঋণ ও শেয়ার উভয় বাজারে অংশগ্রহণ বৃদ্ধি করবে এবং ভারতের আর্থিক ব্যবস্থাকে বৈশ্বিক অর্থনীতির সঙ্গে আরও নিবিড়ভাবে সংযুক্ত করবে।

এই সংস্কারগুলি বিশ্বের দ্রুততম বর্ধনশীল বৃহৎ অর্থনীতিগুলির অন্যতম ভারতের বাজারে সুযোগ খুঁজতে আগ্রহী সামগ্রিক বিনিয়োগকারীদের আরও ব্যাপক অংশগ্রহণকে উৎসাহিত করবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *