সঞ্জয় চক্রবর্তী
প্রথম পর্বের পর……
আসলে আমাদের আত্মগ্লানির প্রচারধর্মী কর্মকাণ্ড তো সেদিন থেকেই শুরু হয়ে গেছে যে দিনে আমরা হঠাৎই আবিষ্কার করলাম যে মানবতার সুপরিকল্পিত প্রদর্শন। এহেন সুন্দর আরো উন্নততর প্রচারমাধ্যম বোধ করি আর কিছুই হয় না। দু-তিন দিনের মধ্যে প্রচুর পরিমাণে খাদ্যদ্রব্য এবং তার সাথে বিভিন্ন রকম শুকনো আহারের জিনিস ক্লাবের ভেতরের ঘরে জমা পরল। চাল, ডাল, আলু, পিয়াজ, সোয়াবিন, বাতাসা, চিড়ে-গুড়-মুড়ি ইত্যাদি। দেখে সত্যিই খুব ভালো লাগলো। সত্যিই তো আমরা আজও দুবেলা সময় মতন খেতে পাই তাই হয়তো বুঝিনা যে খাবার জ্বালাটা কোথায়। শুরু হয়ে গেল প্যাকিং করা। কাল সকাল হলে আমরা পৌঁছে যাব ওদের কাছে। কেন জানি না এই ধরণের অদ্ভুত আত্মতুষ্টিতে মনটা একেবারে ভরে গেল। আগামীদিনের সম্ভাব্য অদ্ভুত এক গ্রাম্য পরিবেশে চিন্তায় সেই রাতটা কোনো রকম কাটলো। ভোর সাড়ে চারটে নাগাদ প্রায় কুড়ি জন ক্লাব সদস্য আমরা ক্লাবের মাঠে হাজির হলাম। আগের দিন রাতেই সমস্ত প্যাকেটগুলো বাক্সবন্দি করে গাড়িতে রাখা ছিল। তাই বের হতে আর দেরি হলো না। আমি বললাম, গদাই, আমরা তো সবাই এই ছোট্ট বাসটাতে যাব রে ভাই। – হ্যাঁ, দাঁড়িয়ে আছো কেন? উঠে পড়ো তাড়াতাড়ি। আমি উত্তরে বললাম, সে ঠিক আছে। কিন্তু বিশু পটলা বঙ্কা, ওরা ৬-৭ জন ওই মালের গাড়িতে উঠেছে কেন? গদাই আশ্বাস দিল, – ওদের চিন্তা করোনা তো, সবাই এক জায়গাতেই পৌঁছাব। গদাই সবার থেকে একটু বেশি মাতব্বরি ফলায়। তাই আমি আর কথা বাড়ালাম না। দেখলাম গদাইও ওদের সাথে গাড়িতে উঠে গেল। যেতে যেতে রাস্তায় জানতে পারলাম, ওই গাড়িতে যারা গেছে তারা নাকি সকাল থেকেই চুটিয়ে মদ গাঁজা খেতে পারবে তার জন্যই একসাথে হয়েছে। আমার আত্মতুষ্টিতে যেন হঠাৎই নিজের রং বদলে ফিকে হয়ে গেল। সারা রাস্তা শুধু খেয়াল করলাম যে নিজের কিসে সুবিধা হবে। নিজেরা কি খাবো, কি করব, শুধু এইসব নিয়ে চিন্তা করতে লাগলাম। ওই লোকগুলো যেন কোথায় হারিয়ে গেল। ভোরের আলো উজ্জ্বল হওয়ার সাথে সাথেই প্রত্যেকের দুঃখে কাতর ফ্যাকাশে মুখ হঠাৎ করেই উৎসব-আনন্দে কেমন জ্বলজ্বল করে উঠলো। প্রায় বেলা এগারোটা নাগাদ আমরা পৌঁছালাম বৈশাখী গ্রামের ফেরিঘাটে। ওইখানেই সমস্ত মালপত্র নৌকাতে চাপিয়ে যেতে হবে ওপারের প্রত্যন্ত গ্রামে। ওইখানেই নাকি দিতে হবে সকল ত্রাণের জিনিসপত্র। কিছুক্ষণের মধ্যে দেখলাম এলাকার কয়েকজন মানুষ হাজির হয়ে গেল। ওরাই গাড়ি থেকে মালপত্র নামিয়ে আবার নৌকাতে তুলে দেয়। ওপারেও একদল লোক আছে যারা নৌকা ওপারে পৌঁছালে এই একই কাজ করে।
