চন্দন চক্রবর্তী

তখন এত রকমারি পিচকিরি পাওয়া যেত না। একটু স্বচ্ছল পয়সাওয়ালা পরিবার পেতলের পিচকিকির ব্যবহার করত। আর আমরা সব অদ্ভুত পিচকিরি বানাতাম। টিনের, বাঁশের, বোতলের, কত রকমের পিচকিরি। পাউডারের লম্বাটে টিনের কৌটোয় রঙ পোরা হতো। ছোট ছোট গর্ত দিয়ে তা বেরোতো। সেই নিয়ে দৌড়তাম। আবার বড় বড় শিশি, বোতলে, রঙ-জল পুরে মুখটায় খড়ের টুকরো টাইট করে গুঁজে দিতাম। ওটা ঝাড়লেই রঙ বেরতো এই পিচকিরিগুলো কত আনন্দ দিয়েছিল। একসময়। একবারই কষ্ট দিয়েছিলো বিধবা মানুষদের মধ্যে সাদা ছাড়া অন্য রঙ থাকতে নেই। দোলের রঙ সর্বত্র লেগে থাকুক, আনন্দ বিতরণ করুক কিন্তু বিধবা মানুষদের কাছে তা ব্রাত্য। কোনক্রমে যদি তাদের গায়ে রঙ লেগে যায় তখন তারা সমাজের চোখে ঘৃণ্য হয়ে যায়। এতটাই অপবিত্র হয়ে যেত যে তাকে স্নান করতে হত তৎক্ষণাৎ। এসব কথা এই বয়সে জানার কথা নয়। আমরা জামতাম না। দুপুর রোদে হেঁটে যাচ্ছিল কুশি বুড়ি। বেচারা কোন ছোটবেলায় বৈধব্য নিয়েছেন-তার নিষেধ সত্ত্বেও বোতল-পিচকিরি থেকে লাল রঙ ছুঁড়েছিলাম। ব্যস হুলস্থুল কাণ্ড! কুশিবুড়ি বাড়ি এসে নালিশ করাতে বেদম মার খেয়েছিলাম কিন্তু দোলের দিন বিধবা মহিলার রঙ মাখতে নেই কেন? তা আজও ঠিক ঠিক জানা হয়নি। তখন আবিরের চল খুব একটা ছিল না। বাজার থেকে শিশি করে, অথবা কাগজে মোড়কে বিভিন্ন রঙ কিনে আনা হত। উদ্ভট বাঁদুরে রঙ যা কিনা সহজে যেত না তাই আনা হত। একটু বড় দাদারা ওসব রঙ ব্যবহার করত। যাইহোক চলত তুমুল রঙ খেলা নাচ-গান। তারপরে একসঙ্গে পুকুরে স্নান করতে নামতাম। বারবার সাবান, তেল মেখে সেসব রঙ তোলা হত।

এরপরে কিশোরবেলা ছেড়ে চলে এলাম শহর কলকাতায়। উঠলাম চেতলার মহেশ দত্ত লেনে। ভাড়া  বাড়িতে। চেতলা বয়েজে ভর্তিও হয়ে গেলাম। প্রথম ফুচকা খাওয়া। আহা কী সুস্বাদু একটি খাদ্য, লাল শালু কাপড়ে মোড়া তিনকোনা বাক্সমতোর মধ্যে থাকত। ছোট্ট ছোট্ট লুচির মত কুড়মুড়ে ভেতরে আলুর পুর আর = তেঁতুল জল দিয়ে গপাগপ খাওয়া। দশ নয়া পয়সায় ছ’টা ফুচকা মিলত। যাইহোক ফুচকাটা হল কলকাতাইয়া সিম্বল তাই উল্লেখ করলাম। কলকাতায় দোলের প্যাটার্নটা একটু ও বদলে গেল।