কলকাতা, ৬ নভেম্বর : মণিপাল হসপিটাল মুকুন্দপুরে সম্প্রতি ৬১ বছর বয়সি এক মহিলার চিকিৎসা করা হয়। দীর্ঘদিনের ডায়াবিটিসের কারণে রক্তে শর্করার মাত্রার ওঠানামার সঙ্গে তাঁর বারবার জ্ঞান হারিয়ে ফেলা এবং বমি হওয়ার সমস্যাকে প্রাথমিকভাবে সম্পর্কিত বলে মনে করা হয়েছিল। তবে সময়মতো রোগ নির্ণয় এবং উন্নত ইমেজিং প্রযুক্তির সাহায্যে তাঁর মস্তিষ্কে দুটি ব্রেন অ্যানিউরিজমের উপস্থিতি শনাক্ত হয়। পরে একটি মিনিমালি ইনভেসিভ নিউরোইন্টারভেনশনাল পদ্ধতির মাধ্যমে সেগুলির চিকিৎসা করা হয়।
উপসর্গগুলির গুরুত্ব বিবেচনা করে কলকাতার বাসিন্দা সুষমা পাল (নাম পরিবর্তিত)-কে ডিজিটাল সাবট্র্যাকশন অ্যাঞ্জিওগ্রাফি (DSA) করানোর পরামর্শ দেওয়া হয়। এটি একটি উন্নত ইমেজিং পদ্ধতি, যার মাধ্যমে রক্তনালিগুলির বিস্তারিত ছবি পাওয়া যায় এবং মস্তিষ্কে রক্ত সঞ্চালনের ক্ষেত্রে কোনও অস্বাভাবিকতা রয়েছে কি না, তা শনাক্ত করা সম্ভব হয়। এই পরীক্ষায় তাঁর মস্তিষ্কে দুটি ব্রেন অ্যানিউরিজমের উপস্থিতি ধরা পড়ে। ধমনীর দেওয়ালের কোনও দুর্বল অংশ ফুলে ওঠার ফলে ব্রেন অ্যানিউরিজম তৈরি হয়। এর আকার, অবস্থান এবং আকৃতির উপর নির্ভর করে এই অ্যানিউরিজম স্থিতিশীল থাকতে পারে অথবা ফেটে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। অ্যানিউরিজম ফেটে গেলে মস্তিষ্কের ভিতরে বা চারপাশে রক্তক্ষরণ হতে পারে।
ব্রেন অ্যানিউরিজম ধীরে ধীরে তৈরি হতে পারে এবং অনেক ক্ষেত্রেই বছরের পর বছর তা শনাক্ত না-ও হতে পারে। রক্তনালির দেওয়ালের কোনও অংশ দুর্বল হয়ে বাইরে দিকে ফুলে উঠলে এই সমস্যা দেখা দেয়। বয়স বৃদ্ধি, উচ্চ রক্তচাপ এবং ধূমপানের মতো বিষয়গুলি এর ঝুঁকি বাড়াতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে জিনগত কারণও এর জন্য দায়ী হতে পারে। অটোসোমাল ডমিন্যান্ট পলিসিস্টিক কিডনি ডিজিজ (ADPKD – অটোসোমাল ডমিন্যান্ট পলিসিস্টিক কিডনি ডিজিজ), যার ফলে কিডনিতে তরলপূর্ণ সিস্ট তৈরি হয় এবং এহলার্স-ড্যানলস সিনড্রোম (EDS – এহলার্স-ড্যানলস সিনড্রোম), যা রক্তনালির শক্তিকে প্রভাবিত করতে পারে, এমন কিছু শারীরিক অবস্থার সঙ্গে ব্রেন অ্যানিউরিজমের ঝুঁকি বৃদ্ধির সম্পর্ক রয়েছে। পরিবারের নিকট আত্মীয়ের ব্রেন অ্যানিউরিজম থাকলেও এই ঝুঁকি বাড়তে পারে। তবে অনেক ক্ষেত্রেই কোনও নির্দিষ্ট কারণ ছাড়াই অ্যানিউরিজম তৈরি হতে পারে। তাই কারও অ্যানিউরিজম থাকলেই যে তার পিছনে জিনগত কারণ রয়েছে, এমনটা নয়।
কিছু ব্রেন অ্যানিউরিজমের ক্ষেত্রে কোনও লক্ষণ দেখা যায় না। আবার কিছু ক্ষেত্রে মাথাব্যথা, দৃষ্টিশক্তিতে সমস্যা, চোখের চারপাশে ব্যথা বা অন্যান্য স্নায়বিক উপসর্গ দেখা দিতে পারে, বিশেষত যখন অ্যানিউরিজম আশপাশের স্নায়ুর উপর চাপ সৃষ্টি করে। অ্যানিউরিজম ফেটে গেলে হঠাৎ অত্যন্ত তীব্র মাথাব্যথা, বমি, ঘাড় শক্ত হয়ে যাওয়া বা জ্ঞান হারানোর মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে, যার জন্য অবিলম্বে চিকিৎসার প্রয়োজন। এই ক্ষেত্রে রোগীর বারবার জ্ঞান হারিয়ে ফেলা, বমি হওয়া এবং রক্তে শর্করার মাত্রার ঘনঘন ওঠানামার বিষয়গুলি আরও বিস্তারিত পরীক্ষার প্রয়োজনীয়তা তৈরি করেছিল। এই উপসর্গগুলিকে শুধুমাত্র দীর্ঘদিনের ডায়াবিটিসের কারণে হচ্ছে বলে ধরে নেওয়া হয়নি। এই ঘটনা থেকে স্পষ্ট যে, কোনও উপসর্গ দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকলে বা বারবার দেখা দিলে, বিশেষত তার নির্দিষ্ট কারণ বোঝা না গেলে, যথাযথভাবে তার মূল্যায়ন করা অত্যন্ত জরুরি।
অ্যানিউরিজমের চিকিৎসার জন্য চিকিৎসকরা একটি মিনিমালি ইনভেসিভ নিউরোইন্টারভেনশনাল পদ্ধতি বেছে নেন। এই পদ্ধতিতে বিশেষ ধরনের ক্যাথেটার এবং রিয়েল-টাইম ইমেজিং প্রযুক্তির সাহায্যে রক্ত সঞ্চালন ব্যবস্থার ভিতর দিয়ে আক্রান্ত রক্তনালিতে পৌঁছনো হয়। অ্যানিউরিজমের আকার, অবস্থান এবং আকৃতির উপর নির্ভর করে চিকিৎসার ক্ষেত্রে এন্ডোভাসকুলার কয়েলিং পদ্ধতি ব্যবহার করা হতে পারে। এই পদ্ধতিতে অ্যানিউরিজমের ভিতরে ছোট ছোট কয়েল স্থাপন করা হয়, যাতে সেখানে রক্তের প্রবাহ কমানো যায়। এ ছাড়া অ্যানিউরিজম ফেটে যাওয়ার ঝুঁকি প্রতিরোধ করতে অন্যান্য বিশেষ পদ্ধতিও প্রয়োগ করা হতে পারে। রোগীর সামগ্রিক শারীরিক অবস্থা, অ্যানিউরিজমের বৈশিষ্ট্য এবং চিকিৎসার সম্ভাব্য ঝুঁকি ও সুবিধাগুলি বিবেচনা করেই চিকিৎসার পদ্ধতি নির্ধারণ করা হয়।
এই প্রসঙ্গে মণিপাল হসপিটাল মুকুন্দপুরের ইমেজিং সায়েন্সেস ও ইন্টারভেনশনাল রেডিওলজি বিভাগের ডিরেক্টর – নিউরোইন্টারভেনশনাল ও এন্ডোভাসকুলার সার্জারি, ডাঃ সুকল্যাণ পুরকায়স্থ বলেন, “ব্রেন অ্যানিউরিজম দীর্ঘদিন কোনও লক্ষণ ছাড়াই থাকতে পারে। অনেক সময় এই সমস্যা শনাক্ত হওয়ার পর রোগী এবং তাঁর পরিবারের সদস্যরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। এই ক্ষেত্রে রোগীর বারবার উপসর্গ দেখা দেওয়ায় সময়মতো পরীক্ষা করানো অত্যন্ত জরুরি ছিল। সমস্যার সঠিক কারণ শনাক্ত হওয়ার পর আমরা অ্যানিউরিজমগুলির চিকিৎসা করতে সক্ষম হই। এই ধরনের সম্ভাব্য প্রাণঘাতী সমস্যার চিকিৎসায় প্রাথমিক পর্যায়ে উপসর্গের মূল্যায়ন, সঠিক রোগ নির্ণয় এবং উপযুক্ত চিকিৎসা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।”
