ওয়েব ডেস্ক; ১১ আগস্ট: গঙ্গার মধ্য ও উজানে ইলিশের (Tenualosa ilisha) প্রত্যাবর্তন নদী পুনরুদ্ধার, জলজ জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং জীবিকা সুরক্ষার ক্ষেত্রে ভারতের প্রয়াসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসাবে চিহ্নিত হল।কয়েক দশক ধরে গঙ্গার ঊর্ধ প্রবাহের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে কার্যত অনুপস্থিত থাকার পর উত্তরপ্রদেশের চন্দৌলি জেলার টান্ডা খুর্দ গ্রামের কাছে ইলিশের সন্ধান মিলেছে। বিজ্ঞানভিত্তিক দীর্ঘমেয়াদী সংরক্ষণ প্রচেষ্টার মাধ্যমে স্থানীয়ভাবে বিলুপ্ত বলে বিবেচিত একটি প্রজাতিকেও ফিরিয়ে আনা যে সম্ভব, এই ঘটনা তারই প্রমাণ।
ঐতিহাসিকভাবে বঙ্গোপসাগর থেকে গঙ্গা নদী ব্যবস্থা ধরে ইলিশের বিচরণ বারাণসী, প্রয়াগরাজ এবং তারও ঊর্ধ্বে বিস্তৃত ছিল। তবে, ১৯৭৫ সালে ফারাক্কা ব্যারেজ চালু হওয়ার পর ইলিশের স্বাভাবিক পরিযানপথ মারাত্মক বাধাগ্রস্ত হয়। এর ফলে গঙ্গার মধ্য ও ঊর্ধ্ব প্রবাহে ইলিশের সংখ্যা দ্রুত কমে যায়। ইলিশনির্ভর নদী তীরবর্তী মৎস্যজীবী সম্প্রদায়ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
ইলিশের পরিবেশগত, পুষ্টিগত, সাংস্কৃতিক এবং জীবিকার গুরুত্ব বিবেচনা করে ব্যারাকপুরের ICAR-সেন্ট্রাল ইনল্যান্ড ফিশারিজ রিসার্চ ইনস্টিটিউট (ICAR-CIFRI) এবং ন্যাশনাল মিশন ফর ক্লিন গঙ্গা (NMCG) ইলিশ পুনরুদ্ধারে দীর্ঘমেয়াদী বিজ্ঞানভিত্তিক কর্মসূচি শুরু করে।
২০১৯ থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত ICAR-CIFRI সমন্বিত কৌশল গ্রহণ করে ইলিশ উদ্ধারে। এর মধ্যে ছিল নদীতে ইলিশের পোনা ও প্রাপ্তবয়স্ক মাছ ছাড়া, মাছের মজুত বৃদ্ধি, কৃত্রিম প্রজনন, নিষিক্ত ডিম ও হ্যাচারিতে উৎপাদিত পোনা ছাড়া, মাছের গায়ে পরিচিতি চিহ্ন লাগানো, মাছ ছাড়ার পর নজরদারি এবং সংশ্লিষ্ট অংশীদারদের অংশগ্রহণ।
এই সময়ে ৩.৮৫ লক্ষের বেশি ইলিশের পোনা ও প্রাপ্তবয়স্ক মাছ নদীতে ছাড়া হয়। ফারাক্কা ব্যারেজের ঊর্ধ্বপ্রবাহে ৪০ লক্ষের বেশি নিষিক্ত ডিম এবং প্রায় ৯.৪ লক্ষ হ্যাচারিতে উৎপাদিত ২ থেকে ৬ দিনের পোনা ছাড়া হয়েছে।
মাছের গায়ে পরিচিতি চিহ্ন লাগানো এবং নিয়মিত নজরদারির মাধ্যমে ইলিশের পরিযান, বেঁচে থাকা এবং গতিবিধি সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গিয়েছে। মৎস্যসম্পদ পুনরুদ্ধার থেকে নদী পুনরুদ্ধার – এই উদ্যোগের ফল ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে।
প্রায় তিন দশক পর চান্দৌলি জেলার মার্কণ্ডেয় মহাদেব মন্দিরের কাছে টান্ডা খুর্দ গ্রামে দুটি ইলিশের সন্ধান মিলেছে। মাছ দুটির মোট ওজন ৭৪০ গ্রাম।
২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের নজরদারিতে এর আগেই মির্জাপুর পর্যন্ত নদীর ঊর্ধ্বপ্রবাহে ছাড়া ইলিশের গতিবিধি ধরা পড়েছিল। এর মাধ্যমে ইলিশের ঐতিহাসিক বিচরণক্ষেত্র ধীরে ধীরে পুনরুদ্ধারের ইঙ্গিত মিলেছে।
ইলিশ একটি সংবেদনশীল পরিযায়ী প্রজাতি। এর উপস্থিতি নদীর সংযোগব্যবস্থা এবং জলজ পরিবেশের উপযোগিতার গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত দেয়।
তাই গঙ্গায় ইলিশের প্রত্যাবর্তন নদীর পরিবেশগত কার্যকারিতা উন্নতির একটি গুরুত্বপূর্ণ জীববৈজ্ঞানিক সূচক।
ইলিশের প্রত্যাবর্তন প্রসঙ্গে ICAR-CIFRI-এর অধিকর্তা ড. প্রদীপ দে বলেন, মৎস্যসম্পদ পুনরুদ্ধারকে পরিবেশ পুনরুদ্ধার এবং সুস্থায়ী জীবিকার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসাবে দেখা প্রয়োজন।
তিনি মাছের পরিযান, জলজ পরিবেশের গুণমান, জীববৈচিত্র্য, জল ব্যবস্থাপনা এবং নদী তীরবর্তী মৎস্যজীবী সম্প্রদায়ের জীবিকার প্রয়োজনকে সমন্বিত করে পরিবেশভিত্তিক নদী ব্যবস্থাপনার ওপর জোর দেন।
ড. দে-র এও অভিমত, পরিবেশ পুনরুদ্ধার তখনই অর্থবহ হয়ে ওঠে, যখন তা সামাজিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিস্থাপকতা বাড়ায়।
ইলিশের প্রত্যাবর্তন মাছের প্রাপ্যতা বাড়াতে, জীবিকার বৈচিত্র্য আনতে এবং নদী তীরবর্তী সম্প্রদায়ের জীবিকা সুরক্ষা জোরদার করতে পারে। একই সঙ্গে গঙ্গার পরিবেশগত ঐতিহ্যও সংরক্ষিত হবে।
বিজ্ঞানভিত্তিক সংরক্ষণের একটি মডেল
ইলিশের প্রত্যাবর্তন শুধু মৎস্যসম্পদ পুনরুদ্ধারের সাফল্য নয়। দীর্ঘমেয়াদী বিজ্ঞানভিত্তিক উদ্যোগ, প্রাতিষ্ঠানিক অঙ্গীকার এবং সমন্বিত সরকারি নীতি কীভাবে ফল দিতে পারে, এই উদ্যোগ তারও উদাহরণ। ICAR-CIFRI ও NMCG-এর অংশীদারিত্বে মৎস্যবিজ্ঞান, নদী সংরক্ষণ, মাঠপর্যায়ের উদ্যোগ এবং স্থানীয় সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণকে একসঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।
ইলিশের প্রত্যাবর্তন অন্যান্য দেশীয় ও পরিযায়ী জলজ প্রজাতি পুনরুদ্ধারের ক্ষেত্রেও আশা জাগায়। এই উদ্যোগ আরও একবার প্রমাণ করে, নদীকে শুধু জল ব্যবস্থাপনার মাধ্যম হিসাবে নয়, জীবন্ত পরিবেশব্যবস্থা হিসাবে পরিচালনা করা প্রয়োজন।
বঙ্গোপসাগর থেকে উজান গঙ্গা পর্যন্ত ইলিশের এই যাত্রা পরিবেশগত স্থিতিস্থাপকতা, বিজ্ঞানভিত্তিক দীর্ঘমেয়াদী প্রয়াস এবং গঙ্গা ও তার নদী তীরবর্তী মৎস্যজীবী সম্প্রদায়ের জন্য নতুন আশার প্রতীক।
